হরর ভিডিও গেমে আপনি সত্যিকার অর্থেই “হরর” বা ভৌতিক স্বাদ পাবেন কি পাবেন না সেটা আপনার উপরেই অনেকাংশে নির্ভর করে। হরর গেমসগুলোকে নির্মাতারা ওয়ের্স্টান হরর কালচারের উপর নির্মাণ করে থাকেন। আমাদের উপমহাদেশে বিশেষ করে বাংলাদেশ, ইন্ডিয়ায় হরর বা ভৌতিক জিনিস বলতে আমরা “ভূত, পেত, আত্মা” ইত্যাদি অশরীরিদেরকে বুঝে থাকি। কিন্তু ওয়েস্টার্ন কালচারে ভৌতিক জিনিসকে তারা জুম্বি, ক্যানিবাল (জীবন্ত মরা মানুষ কিংবা মানুষ খেকো মানুষ!) ইত্যাদিতে বুঝে থাকে। তাই তো ভৌতিক গেমগুলোতে আপনাকে জুম্বি বা ক্যানিবাল জাতীয় “ভুত”দের সাথে যুদ্ধ করতে হয়। হরর ভিডিও গেমে আসলেই ভৌতিক ফিল আমি সর্বশেষ পেয়েছিলাম Outlast এবং Outlast 2 এই দুটি গেমে। তবে হরর ভিডিও গেমের আদিপিতা রেসিডেন্ট ইভিল কে ভূলে গেলে চলবে? সেই ১৯৯৬ সাল থেকে সিরিজটি একের পর এক হরর ভিডিও গেম নির্মাণ করেই যাচ্ছে আর আমরা খেলেই যাচ্ছি! তবে রেসিডেন্ট ইভিল গেমগুলো অনেকটাই একশন ধাঁচের হরর গেম। যেখানে আপনাকে অনেক সময়ই বিভিন্ন দৈত্য দানবদেরকে গুলি করে মেরে ফেলতে হয়। রেসিডেন্ট ইভিল সিরিজের Resident Evil 4 গেমটির সাফল্যের পর কোম্পানির অনেক বছর কেটে গিয়েছে আরেকটি ব্লকব্লাস্টার গেম উপহার দিতে। কিন্তু গত বছর সিরিজের লেটেস্ট গেম Resident Evil 7 দিয়ে সিরিজটি আবারো গেমারদের নজরে চলে এসেছে। আর আজ আমি গেমটির রিভিউ নিয়ে চলে এলাম আপনাদের সামনে।

রেসিডেন্ট ইভিল সিরিজের আগের দুটি মেইন গেমস Resident Evil 5 এবং Resident Evil 6 এর থেকে কিছুটা আলাদা হয়ে সিরিজের আগের গেমসগুলোর সারভাইবাল হরর ধাঁচকে পূঁজি করে এই Resident Evil 7 গেমটি নির্মিত হয়েছে। আর আরেকটি কথা, সিরিজের এটিই কিন্তু প্রথম FPP গেম, মানে ফার্স্ট পারসন ক্যামেরা ভিউয়ের প্রথম রেসিডেন্ট ইভিল গেম হচ্ছে এটি। আর নির্মাতা কোম্পানি Capcom এর এই ফার্স্ট পারসন সেটিংয়েই বেশ বাজিমাত করতে পেরেছে। গেমটি এখন পর্যন্ত প্রায় ৫ মিলিয়ন কপি বিক্রি করতে সক্ষম হয়েছে, প্রতিটি কপির দাম ৩০ মার্কিন ডলার হলে কোম্পানির টোটাল ইনকাম কত হলো নিজেই মিলিয়ে দেখুন! এছাড়াও এই গেমটিতে Capcom এর নিজস্ব গেম ইঞ্জিণ “Re-Engine” ব্যবহার করা হয়েছে।

রেসিডেন্ট ইভিল গেমটির স্টোরিলাইন সাজানো হয়েছে প্লেয়ার চরিত্র Ethan Winters এবং তার মিসিং স্ত্রী Mia কে খোঁজাকে নিয়ে। ইথান তার স্ত্রীকে খুঁজার জন্য Dulvey, Louisiana অঞ্চলে যায় এবং সেখানে সে অদ্ভুত Baker ফ্যামিলির সন্ধান পায়। এই ফ্যামিলির সদস্যগুলো বেশ উদ্ভট এবং কালোজাদুর বলে immortal হয়ে রয়েছে বলে ইথান বুঝতে পারে। কিন্তু Baker ফ্যামিলির সদস্যরা ইথানকে ধরে ফেলে এবং টর্চার করা শুরু করে। আর গেমটিতে আপনাকে এই ইথান চরিত্রে Baker ফ্যামিলির হাত থেকে মুক্ত হয়ে ফ্যামিলির বিশাল বাগানবাড়ীতে আপনার হারিয়ে যাওয়া স্ত্রীর খোঁজ করতে হবে।

সিরিজের আগের গেমসগুলোতে আপনাকে জোম্বি এবং Bioweapons দের সাথে একশন সিকুয়েন্সের মতো একপ্রকার মিলিটারী ধাঁচের যুদ্ধ করতে হতো। আর ভুতদের সাথে আপনি যদি অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধে নামেন সেখানে কিন্তু আসল “হরর” বা ভৌতিক ফিলটা অনেক ক্ষেত্রেই হারিয়ে যায়। আর তাই তো Outlast সিরিজের গেমসগুলোতে প্লেয়ারকে কোনো প্রকার অস্ত্রের ব্যবহারই করতে দেয়নি নির্মাতারা! কিন্তু রেসিডেন্ট ইভিল ৭ গেমটিকে সিরিজের আগের গেমসগুলোর মতো একশন প্যাক না করে সারভাইবাল ধাঁচে বেশি গুরুত্ব নিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। আর সাথে রয়েছে ফার্স্ট পারসন ক্যামেরা ভিউ, সব মিলিয়ে রেসিডেন্ট ইভিল সিরিজে যে রকম ভৌতিকতা আমরা চাই সেরকমই এই গেমে আমরা পাবো।

Over-the-shoulder ভিউপয়েন্ট বা থার্ড পারসন ভিউ ক্যামেরা কে বাদ দিয়ে ফার্স্ট পারসন ভিউ গেমটিতে আনায় এবার আপনি কিন্তু আপনার সামনে কি ঘটছে সেটাই মূলত দেখতে পারবেন। এখন আশেপাশে কি ঘটছে কিংবা আপনার পেছনে কে শব্দ করলো সেটা দেখার জন্য কিন্তু আপনাকে মাউস ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতে হবে। আর হঠাৎ আপনার জন্য কি অপেক্ষা করছে এটাই আসল ভৌতিক ধাঁচের মজা। গেমটির প্রথম অর্ধেক অংশটি অনেকটাই আউটলাস্ট সিরিজের মতো। প্রথম অর্ধেক অংশে অনেক সময়ই Jack Baker কিংবা তার ভয়ংস্কর স্ত্রী Marguerite ঘরটির বিভিন্ন অংশে প্লেয়ারকে মানে ইথানকে খুঁজতে থাকবে। আর এখানে আপনার মূল কাজ হচ্ছে সারভাইব করা বা বেঁচে থাকা। এই দুটি চরিত্রকে আপনি এই অংশে মারতে পারবেন না। তাই তাদের নজর থেকে আপনাকে বেঁচে থাকতে হবে এবং একই সাথে আপনার স্ত্রীকে খোঁজ করতে হবে (অনেকটাই আউটলাস্ট ২ এর স্টোরিলাইনের মতো)। কিন্তু এর জন্য আপনাকে বিভিন্ন পাজলের সমাধান করে তবেই Resident Evil 7 গেমটির স্টোরিলাইনের সামনে এগিয়ে যেতে হবে।

তবে এটা যেহেতু আউটলাস্ট নয় তাই গেমটিতে আপনি বিভিন্ন অস্ত্র ব্যবহার করতে পারবেন, এদের মধ্যে রয়েছে পিস্তল, শটগান, ফ্লেমথ্রোয়ার ইত্যাদি। এছাড়াও গেমটিতে রয়েছে কয়েকটি বস! তবে এই বস বা বস ফাইটিং বিষয়টি নিয়ে অনেকেই দ্বিমত পোষণ করেছেন। অনেকেই মনে করেন যে গেমটিতে অতিরিক্ত বস ফাইটিং সিকুয়্যেন্স না দেওয়া থাকলে আরো সুন্দর গেম হতো পারতো এই রেসিডেন্ট ইভিল ৭ । তবে অস্ত্রের ব্যবহার রয়েছে বলেই মনে করবেন না যে গুলি করেই বসদের মেরে ফেলবেন! বসদের সাথে ফাইটিং করার সময় আপনাকে অস্ত্রের পাশাপাশি বিভিন্ন পারিপাশ্বিক পরিবেশের টুলগুলোকেও ব্যবহার করতে হবে। এছাড়াও ফার্স্ট পারসন ভিউতে অস্ত্রে শুটিংয়ের বেশ বাস্তব ভিক্তিক ফিল আপনি পাবেন, কারণ গেমটির অস্ত্রগুলোকে সঠিক পরিমাণের ওজন এবং রিকয়েল ব্যবহার করা হয়েছে যা বাস্তবভিক্তিক অস্ত্রের স্বাদ আপনাকে দিতে পারবে।

আর গেমটির কমবাট সিস্টেমকেও বেশ সুন্দর ভাবেই সাজানো হয়েছে। অস্ত্রের Aim করার সময় আপনার মুভমেন্ট স্পিড বেশ কম হবে যেটা বাস্তবে হওয়া কথা আর দৈত্য বা ভূতদের মারতে হলে আপনার চাই পিনপয়েন্ট শুটিং। উড়াধুরা শুট করলে চলবে না! জায়গা মতো গুলি করলেই ভূতগুলোকে এক গুলিতেই আপনি মারতে পারবেন। আর চাইলেই আপনি সহজেই সাইডের কোনো কর্ণারে গিয়ে আপনার অস্ত্রেকে রিলোড করতে পারবেন। অন্যদিকে পাজলের কথা যদি বলি তাহলে এই ক্ষেত্রে একটু সমস্যা রয়েছে। কারণ গেমটির পাজলগুলো তুলনামূলকভাবে বেশ সহজ! রেসিডেন্ট ইভিল ৪ গেমটির পাজলের কথাই ধরুন, সে গেমের এক একটি পাজল সলভ করতে গিয়ে আমার ঘাম বেরিয়ে গিয়েছিলো। এই জিনিসটি বাদ দিলে Resident Evil 7 গেমটির বেশ ভালো এবং চমৎকার একটি হরর গেম যেখানে সারভাইবাল ধাঁচ রয়েছে, রয়েছে কমবাট ধাঁচ এবং রয়েছে পাজল ধাঁচ!

আর Resident Evil 7 গেমটি বেশ হাই গ্রাফিক্স ওয়ালা একটি গেম। গ্রাফিক্স লো করে খেললে গেমটির চমৎকার ডিজাইনিং উপভোগ আপনি করতে না পারলেও গেমটি খেলতে পারবেন। গেমটি খেলতে হলে নুন্যতম ৪ গিগাবাইট র‌্যাম, কোর আই ৩ প্রসেসর এবং ১ গিগাবাইটের গ্রাফিক্স কার্ডের প্রয়োজন হবে আপনার। তবে একেবাবেই নিম্ন রেজুলেশন দিয়ে সবকিছুর সেটিংস লো করে দিয়ে ইন্টেল এইচডি গ্রাফিক্সেও গেমটি চলবে কিন্তু ১৫/২০ এর বেশি FPS স্পিড আপনি পাবেন না। কোর আই ৫ প্রসেসর, ৮ গিগাবাইট র‌্যাম এবং ২ গিগাবাইটের গ্রাফিক্স কার্ড থাকলে গেমটিকে আপনি বেশ ভালো সেটিংয়েই উপভোগ করতে পারবেন।

এটা কি ধরণের পাজল আপনারাই বলুন!

তো অনেক বছর পর রেসিডেন্ট ইভিল তার অরিজিনাল হরর ধাঁচে ফিরে এসেছে Resident Evil 7 গেমটির মাধ্যমে, তবে সেটা অনেকটাই সম্ভব হয়েছে ফার্স্ট পারসন ভিউয়ের জন্য। আশা করবো গেমটি আপনাদের কাছে বেশ চমৎকারই লাগবে যদি সারভাইব ধাঁচের সাথে হালকা কমবাট সিস্টেম আপনার পছন্দ হয়ে থাকে তবে। আর ইতিমধ্যেই গেমটির একটি সিকুয়্যাল নির্মাধীন অবস্থায় রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে গেমটির নির্মার্তা কোম্পানি Capcom ।

নিমার্তা এবং প্রকাশক:

Capcom

সিরিজ:

রেসিডেন্ট ইভিল

খেলা যাবে:

মাইক্রোসফট উইন্ডোজ

প্লে-স্টেশন ৪

এক্সবক্স ওয়ান

নিনটেনডু সুইচ প্লাটফর্মে।

মুক্তি পেয়েছে:

জানুয়ারী, ২০১৭

খেলার ধাঁচ:

Survival Horror

খেলার মোড:

সিঙ্গেল প্লেয়ার

সিস্টেম রিকোয়ারমেন্টস:

মিনিমাম রেকোমেন্ডেড
পঞ্চম প্রজন্মের কোর আই ৩ প্রসেসর (3MB Cache) ৭তম প্রজন্মের কোর আই ৫ প্রসেসর ৩.২০ গিগাহার্জ
৪ গিগাবাইট র‌্যাম ৮ গিগাবাইট র‌্যাম
২ গিগাবাইটের গ্রাফিক্স কার্ড (DDR3 হলেও ডাইরেক্ট এক্স ১১ সার্পোটেড হতে হবে) জিফোর্স জিটিএক্স ৯৬০ কিংবা রাডিয়ন আর ২৮০এক্স গ্রাফিক্স কার্ড
৫০ গিগাবাইট ফ্রি হার্ডডিক্স স্পেস
৬৪ বিটের অপারেটিং সিস্টেম (নূন্যতম উইন্ডোজ ৭)

গেমটির দাম:

২৯.৯৯ মার্কিন ডলার