ওয়েল!আগে প্রতি বছরে আমরা নতুন “একটি” আইফোনের দেখা পেতাম। পরবর্তীতে সেটাকে “দুটি” আইফোনে রূপান্তর করা হয়। আর এবার এবছরে আমরা পেলাম একই সাথে নতুন “তিনটি” আইফোন। iPhone XR, iPhone XS এবং iPhone XS Max । আজ কথা বলো সবথেকে “সস্তা” মডেল iPhone XR কে নিয়ে। এই মডেলটি দিয়ে আইফোন “বাজেট” মার্কেটে আসার চেষ্টা করেছে। তবে ৭৫০ মার্কিন ডলার রেঞ্জে তারা কোন প্রকারের “বাজেট” স্মার্টফোন বুঝিয়েছে তা কেবল অ্যাপলই জানেন। খোদ আমেরিকার মানুষই বলছে যে বাজেট স্মার্টফোন বলতে ৪০০ মার্কিন ডলারের নিচে হওয়া উচিত! আর বাংলাদেশে ডিভাইসটি দাম আপনি ৮০ হাজারের নিচে পাবেন না । সো, ৮০ হাজার টাকার স্মার্টফোনকে অ্যাপল “বাজেট” ফোন বলে আখ্যায়িত করছে! ব্যাপারটা কেমন জানি না??

যাই হোক আজকের পোষ্টে আমি এ বছরের “বাজেট” আইফোন মানে iPhone XR ডিভাইসটিকে নিয়ে কিছু কথা বলবো। অন্য দুটি ডিভাইসের বাজেট না থাকলে আপনার কি ৮০ হাজার টাকার বেশি বাজেট দিয়ে ডিভাইসটি কেনা উচিত হবে কিনা সেটা নিয়েও কথা বলবো।

অ্যাপল কিন্তু সাধারণত কোনো বাজেট ফোন বানায় না। তবে এবছর তারা একটি বাজেট আইফোন বানিয়েছে। মানে অনান্য স্মার্টফোনের তুলনায় নয় বরং অনান্য “আইফোনের” তুলনায় এবছর আমরা একটি বাজেট আইফোন পাচ্ছি। আর সেটা হচ্ছে iPhone XR । আপনি যদি এ বছরের অন্যদুটি আইফোনের সাথে এটার তুলনা করেন তাহলে দেখবেন যে তেমন খুব বেশি একটা পার্থক্য নেই। বলে রাখা ভালো যে বাকি দুটি আইফোন XS এবং XS Max এর দাম শুরু হয় ১০০০ এবং ১১০০ মার্কিন ডলার থেকে। তবে XR থেকে বাকি দুটি ডিভাইসেও আপনি Face ID ফিচারটি পাবেন। তিনটি ডিভাইসেই আপনি পাবেন “নচ” সিস্টেম এবং তিনটি ডিভাইসেই রয়েছে edge-to-edge ডিসপ্লে। আর সবথেকে বড় কথা হচ্ছে তিনটি ডিভাইসই একই A12 প্রসেসর নিয়ে তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু XR ডিভাইসটি XS এর থেকে দামে তুলনামূলক ভাবে অনেক কম, আর এই দাম কমানো জন্য ডিভাইসটিতে কয়েকটি বিষয়কে কাটসাট করেছে অ্যাপল। প্রথম চেঞ্জ আনা হয়েছে এর বিল্ডে, অনান্য দুটি ডিভাইস স্টিলের তৈরি হলেও XR ডিভাইসটিকে তৈরি করা হয়েছে এলুমিনিয়াম দিয়ে। অন্যদিকে Water Resistance রেটিং IP68 থেকে কমিয়ে নিয়ে ডিভাইসটিতে রাখা হয়েছে IP67 রেটিং। অর্থাৎ ২ মিটারের স্থানে ১ মিটারের পানিতে আপনি XR ডিভাইসকে ৩০ মিনিট পর্যন্ত ডুবিয়ে রাখতে পারবেন। আর সবথেকে বড় পার্থক্য হচ্ছে ডিসপ্লে এবং ক্যামেরায়। XR ডিভাইসে ব্যবহার করা হয়েছে “সস্তা” LCD ডিসপ্লে যেখানে অন্য দুটি ডিভাইসে পাবেন OLED ডিসপ্লে আর এখানে আপনি একটি ক্যামেরা লেন্স পাবেন ডিভাইসটির ব্যাকে যেখানে বাকি দুটি ডিভাইসকে ডুয়েল রেয়ার ক্যামেরা সেটআপে সাজানো হয়েছে। এই বিষয়টি অনেকেই পছন্দ করেনি।

কারণ আপনি অ্যাপলকে সাইডে রেখে এই ৭০০ মার্কিন ডলার রেঞ্জে অনান্য ব্রান্ডের অনেক ফোনই পাবেন যেগুলোতে যেমন ওয়ানপ্লাস ব্রান্ডের ডিভাইসে আপনি ৫৫০ মাকির্ন ডলার রেঞ্জে ডুয়াল রেয়ার ক্যামেরা, OLED ডিসপ্লে এবং বর্তমান যুগের চিপসেট পেয়ে যাবেন। তবে আইফোন বলে কথা!

তবে বাজেট থাকলে সরাসরি iPhone XS Max ফোনটিতে চলে যাওয়াটাই বেটার মনে করি, আর বাজেট না থাকলে iPhone XR নিতে পারেন। কেন নিবেন সেটাই আজ বলবো।

কালার চয়েজ!

iPhone XR এর অন্যতম মূল আর্কষণ হচ্ছে এর রং! হ্যাঁ অনেক দিন পর অ্যাপল তাদের iPhone 5C সিচুয়েশন নিয়ে এসেছে। প্রায় অনেকবছর আমরা আইফোনে আবারো ধরাবাধা কয়েকটি কালার ডিজাইন রেখে অনেকগুলো কালার ডিজাইন পাবো। iPhone  XR ডিভাইসে সাধারণ সাদা কালো ডিজাইনের পাশাপাশি আপনি red, coral, yellow এবং blue কালার পাবেন। কালারগুলো চোখে পড়ার মতো হলেও কালারফুল XR ডিভাইসকে বাকি দুটি ডিভাইস মানে XS এবং XS MAX এর পাশে রাখলে তাদের থেকে এটার ডিজাইনকে আপনার আসলেই “সস্তা” মনে হবে!

নচ নচ কচ কচ!

অনান্য দুটি ডিভাইসের মতোই XR ডিভাইসে আপনি পাবেন অ্যাপলের সিগনেচার “নচ” ফিচারটি। আর সাথে পাবেন ফেইস আইডি ফিচারও! আর এই ফেইস আইডি অপশনটি গত বছরের iPhone X এর ফেইস আইডির থেকেও কিছু দ্রুতগতিতে কাজ করবে! ডিভাইসটির পেছনের দিকে লুকটি সস্তা মনে হলেও সামনের অংশটি তে আপনি পাবেন প্রিমিয়াম লুক! আরেকটি কথা এই ফোনটি সহ আপকামিং সকল আইফোনেই আর Touch ID ফিচারটি নেই। আপনাকে একমাত্র Face ID দিয়ে কাজ চালাতে হবে। আর আরেকটি কথা হচ্ছে দামে সস্তা হলেও এতে ব্যবহার করা হয়েছে ৬.১ ইঞ্চির বিশাল ডিসপ্লে! গতবছরের iPhone X এবং এ বছরের iPhone XS দুটি ডিভাইসেই আপনি পাবেন ৫.৮ ইঞ্চির ডিসপ্লে। আর ইতিহাসের সবথেকে বড় ডিসপ্লের আইফোন নিতে চাইলে চলে যান ৬.৫ ইঞ্চির iPhone XS MAX তে!

iPhone 8 Plus এবং XR

আইফোন ১০ এবং ১০এস এর থেকে ডিসপ্লে সাইজ বড় হলেও আগেই বলেছি যে এতে ব্যবহার করা হয়েছে LCD প্যানেল। আপনি ১২/১৩ হাজার টাকার শাওমি ফোনেও LCD ডিসপ্লে প্যানেল পেয়ে যাবেন। বাকি দুটি ডিভাইসে OLED প্রযুক্তির চমৎকার ডিসপ্লে ব্যবহার করা হয়েছে যা মতো কোয়ালিটি ধারেকাছেও আপনি XR ডিভাইসে পাবেন না। XR ডিভাইসে কালো রংটিও সম্পূর্ণ কালো আপনার কাছে নাও মনে হতে পারে, মনে হতে পারে কালো রংকে বার বার ধুতে ধুতে ধূসর কালো বানিয়ে ফেলা হয়েছে! আর আরেকটি কথা হলো ফুল স্ক্রিণ ভিডিও বা গেম খেলার সময় নচের উপস্থিতি আপনি টের পাবেন। কারণ LCD প্যানেলের উপর সম্পূর্ণ কালো ইফেক্ট না পাওয়ায় নচকে সম্পূর্ণরূপে হাইড করা যায় না XR ডিভাইসে। তবে XS ও XS MAX ডিভাইসের OLED প্রযুক্তির কারনে এই সমস্যাটা সেখানে আপনি পাবেন না।

XR ডিভাইসটিতে ব্যবহার করা হয়েছে 1792 x 828 ডিসপ্লে রেজুলেশন যা XS এবং iPhone 8 Plus এর থেকে কম, তবে খালি চোখে এই কমতি আপনার ধরা পড়বে না। যেটা ধরা পড়বে সেটা হলো এর পিক্সেলের ঘাটতি। iPhone XR ডিভাইসে ব্যবহার করা হয়েছে 326 ppi পিক্সেল যা iphone 8 এর সমান। বলা বাহুল্য যে XS ডিভাইসে ব্যবহৃত হয়েছে 458 ppi এবং iphone 8 plus ডিভাইসে ব্যবহৃত হয়েছে 401 ppi । মানে হচ্ছে XR ডিভাইসে এলসিডি ডিসপ্লেতে আপনি পিক্সেলগুলোকে সহজেই দেখতে পারবেন। ফটো জুম করে দেখতে গেলে এই পিক্সেলগুলো আপনাকে বেশ ঝামেলা করতে পারে। তবে ডিভাইসটিকে একদম চোখের কাছে নেওয়া ছাড়া পিক্সেলগুলোকে দেখতে পারবেন না তাই এটা অনেকের কাছে কোনো ইস্যু হবে না।

পারফরমেন্সে ঘাটতি হবে না!

এ ব্যাপারে অ্যাপলকে বাহবা দিতেই হয়! এর আগে যখন অ্যাপল বাজেট ফোন বানিয়েছিলো সেটা হলো iPhone SE । SE ডিভাইসে দারুণ হার্ডওয়্যার ডিজাইন ব্যবহার করা হলেও তখনকার সময়ের থেকে বছরখানেক আগের প্রসেসর সেখানে ব্যবহার করা হয়েছিলো। তবে এখন অ্যাপল এই পদ্ধতিটি অনুসরণ করেনি। আপনি XS এবং XS MAX ডিভাইসটির মতোই XR ডিভাইসেও পাবেন একই পাওয়ারফুল A12 প্রসেসর! হ্যাঁ! দামে সস্তা হলেও অনান্য দুটি ডিভাইসে থেকে কম পারফরমেন্স আপনি পাবেন না! আপনি যদি এভারেজ ইউজার হন, স্মার্টফোনে ব্রাউজিং, ইমেল চেক, হালকা পাতলা নিউজ পড়া, সোশাল মিডিয়া চেকিং এবং টুকিটাকি গেমস খেলেন তাহলে XR এর পারফরমেন্স থেকে XS, XS MAX এর পারফরমেন্সের মধ্যে কোনো পার্থক্য খুঁজে পাবেন না।

আরেকটি উল্লেখ যোগ্য বিষয় হচ্ছে XR ডিভাইসে ব্যাটারিকে ভালোভাবেই সেটআপ করা হয়েছে, তাই XR ডিভাইসটি বর্তমান যুগের  আইফোনের সস্তা ভার্সন হলেও আগের প্রজন্মের সকল আইফোন ডিভাইসের থেকে ভালো ব্যাটারি ব্যাকআপ আপনি পেয়ে যাবেন। XR ডিভাইসের ব্রাইটনেস সর্বোচ্চ করে দিয়ে Wifi চালিয়ে টানা ইউটিউব ভিডিও দেখতে থাকলে আপনি ১২ ঘন্টার ব্যাকআপ পাবেন! একই পদ্ধতি iPhone 8 Plus ডিভাইসেও ফলো করা হয়েছে কিন্তু XR এর থেকে বড় ব্যাটারি সাইজ হবার পরেও ৮ প্লাস ডিভাইসটি ৯ ঘন্টা ১০ মিনিটের ব্যাটারি ব্যাকআপ দিয়েছে। অন্যদিকে XS ডিভাইসটি ১১ ঘন্টা ১১ মিনিট এবং XS MAX ডিভাইসটি ১৩ ঘন্টা ৭ মিনিটের ব্যাটারি ব্যাকআপ দিতে পেরেছে।

একটি ক্যামেরা পোষাবে কি?

অবশ্যই! এটলিস্ট আগের প্রজন্মের আইফোনগুলোর থেকেও ভালো কোয়ালিটির ছবি আপনি XR ডিভাইসটি দিয়ে তুলতে পারবেন। ২০১৭ সালের সিঙ্গেল লেন্সের ফোন iPhone 8 এর থেকেও অনেক ভালো কোয়ালিটির ছবি পাবেন XR ডিভাইসে। ডুয়াল লেন্সের 8 Plus ডিভাইসটি মতোই কোয়ালিটি পাবেন সিঙ্গেল লেন্সের iPhone XR ডিভাইসে! কিন্তু কেন?

সিঙ্গেল লেন্সের XR এবং ডুয়েল লেন্সের 8 Plus

কারণ হচ্ছে  A12 প্রসেসর! জ্বী! এ কারণেই ডুয়াল লেন্সের 8 Plus ডিভাইসটির মতোই ক্যামেরা কোয়ালিটি পাচ্ছেন XR ডিভাইসে।  তবে XS এবং XS MAX এর একই প্রসেসর ও সফটওয়্যার ব্যবহার করা হলেও তাদের মতো ক্যামেরা কোয়ালিটি আপনি XR ডিভাইসে পাবেন না, কারণ ডুয়াল লেন্স বনাম সিঙ্গেল লেন্সের একটি ব্যাপার রয়েছে এতে। মানে হলো সহজ, XR ডিভাইসে আগের প্রজন্মের ডুয়েল লেন্সের ক্যামেরার মতোই আপনি ক্যামেরা পারফরমেন্স পাবেন কিন্তু বর্তমানের dual lense আইফোন মতো পাবেন না! তাই বর্তমানে ৭০০ মার্কিন ডলার খরচ করে iPhone 8 Plus না নিয়ে আমি আপনাকে সাজেস্ট করবো ৫০ ডলার বাজেট বাড়িয়ে ৭৫০ মার্কিন ডলারে iPhone XR কে নিয়ে নিতে, বিশেষ করে যদি আপনি ক্যামেরার জন্য আইফোন কিনেন তবে।

পরিশিষ্ট

তবে যাই বলেন, LCD ডিসপ্লের সাথে OLED কখনোই পাল্লা দেওয়া যায় না। XR এর ডিসপ্লে দেখুন আর ডান দিকের গতবছরের iPhone X এর OLED ডিসপ্লে দেখুন, খালি চোখেই পার্থক্য বুঝতে পারছেন

iPhone XR একটি চমৎকার ডিভাইস। বিশেষ করে আপনি XS, XS MAX এর সমান প্রসেসরটাই পাচ্ছেন, নচ পাচ্ছেন এবং আগের প্রজন্মের আইফোনের থেকেও ভালো ব্যাটারি ব্যাকআপ পাবেন। তবে ব্রান্ড নিউ আইফোনের স্বাদ ৭৫০ মার্কিন ডলারে পেতে চাইলে আপনাকে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, উন্নত ডিসপ্লে পাবেন না এবং পাবেন না পেছনের ক্যামেরায় portrait শট! এই দুটি বিষয় যদি আপনি মেনে নিতে পারেন তাহলে আইফোন XR আপনার জন্য অবশ্যই ভালো একটি ডিভাইস! এটা অ্যাপল ডিভাইস ফ্যানদের জন্য। অন্যদের জন্য ৮০ হাজার টাকা খরচ করে সিঙ্গেল লেন্সের LCD ডিসপ্লে ওয়ালা ডিভাইস কেনাটা শ্রেফ বোকামি ছাড়া আমার কাছে অন্য কিছু মনে হয় না! এট লিস্ট ৫০ হাজার টাকার নিচে হলে একে আসলেই “আইফোনের বাজেট” সংস্করণ বলা যেত। তবে যেহেতু A12 প্রসেসর দিচ্ছে তাই এর প্রাইস এতটা হাই লেভেলের! আর অ্যাপল ব্রান্ড নেম তো আছেই!

এ বছরের সকল আইফোনের স্পেসিফিকেশন

image credit: Alex Cranz (Gizmodo)

আর সময় পেলে পড়ে আসুন আমাদের iPhone XS এর রিভিউটি