আগামি কয়েক মাস পরেই রিলিজ হতে যাচ্ছে থার্ড জেনারেশন রাইজেন সিপিউ সিরিজ। আগের দুই জেনারেশন থেকে সেইম প্রাইস রেঞ্জে দিগুণ কোর ও থ্রেড কাউন্ট আমরা দেখতে যেতে পারি। অবশ্য ইতিমধ্যেই গ্রেট প্রাইস টু পারফর্মেন্স রেশিওর কারণে বাংলাদেশের মানুষের কাছেও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে রাইজেন। অবশ্য এখনো রাইজেনের মধ্যে বেশ কিছু লিমিটেশন রয়ে গিয়েছে যা আশা করা যাচ্ছে ৩য় জেনারেশনে থাকবে না। কিন্তু আজ রাইজেনের পারফর্মেন্স বা পজিটিভ নেগেটিভ নিয়ে কিছু লেখা হবে না, বরং রাইজেন সিপিউ নিয়ে এখনো মানুষের মনে বিশেষ করে বাংলাদেশী পিসি ক্রেতা, বিক্রেতা এবং ব্যবহারকারীদের মধ্যে যে সকল ভুল ধারণা রয়েছে তা নিয়েই আলোচনা করা হবে।

রাইজেন সিপিউ বেশি গরম হয়ে যায়

রাইজেন সিপিউ লঞ্চ হবার পর থেকেই বিভিন্ন মানুষ বিশেষ করে বর্তমান কম্পিউটার মার্কেট সম্পর্কে অজ্ঞ কম্পিউটার বিক্রেতাদের কাছে এই জিনিসটি অনেকেই শুনে আসছেন। আর তা হচ্ছে রাইজেন সিপিউ ওভারহিট হয়ে যায়। এ এম ডির আগের FX সিরিজের প্রসেসরগুলো ওভারহিট হয়ে যাওয়ার রেকর্ড থাকলেও রাইজেন প্রসেসরে আমরা একদমই এমন ওভারহিট ইস্যু দেখতে পাইনি। প্রথম জেনারেশনের 300 সিরিজের মাদারবোর্ডে VRM এর কারণে শুরুর দিকে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি তাপমাত্রা দেখতে পাওয়া গেলেও কন্সিস্টেন্ট বায়োস আপডেটের কারণে তা ফিক্স হয়ে যায়।

অবশ্য বর্তমান জেনারেশনের B450 এবং X470 মাদারবোর্ডে আমরা এই সমস্যা একদমই দেখতে পাইনি, এবং সেকেন্ড জেনারেশন প্রসেসরে এখনো কোন প্রকার ওভারহিটিঙের খবর পাওয়া যায় নি। উল্লেখ্য গরম হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটি শুধুমাত্র উচ্চ মাত্রায় ওভারক্লক করতে গেলে হয়েছিল। সুতরাং যারা এখনো সন্দিহান আছেন যে রাইজেন সিপিউ সত্যিই ওভারহিট হয়ে যায় নাকি তাদের জন্য বলছি, যথাযথ কুলিং সলিউশন প্রয়োগে আপনার সিপিউর তাপমাত্রা কাংখিত লক্ষ্যমাত্রার মধ্যেই থাকবে। তবে স্টক কুলার দিয়ে ওভারক্লক না করাই উত্তম।

Stock Performance vs Overclocked Performance

এখন উপরের শেষ লাইন আমাদের যে পয়েন্টে আনে তা হচ্ছে রাইজেন সিপিউর স্টক পারফর্মেন্স বনাম ওভারক্লকড পারফর্মেন্স। এটি শুধু সিপিউ নয়, বরং এপিউর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। রাইজেন সিরিজের সকল সিপিউ এবং এপিউকে আনলকড হিসেবেই রিলিজ করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রত্যেকটি সিপিউ এবং এপিউকে আপনি ওভারক্লক করতে পারবেন। রাইজেন সিপিউ রিলিজের সময় স্পষ্ট বলে দেয়া হয়েছিল যে ওভারক্লকিঙ্গের মাধ্যমে এই সিপিউ সিরিজের সত্যিকারের পটেনশিয়াল বের হয়ে আসবে। কিন্তু ওভারক্লকিঙ্গের বেটার পারফর্মেন্স সম্পর্কে জানা সত্ত্বেও এখনো অনেকেই স্টক সেটিংস বা ১০০/২০০ মেগাহার্টজ ওভারক্লক করে রেখে দিচ্ছেন। এর ফলে রাইজেন ইউজাররা বেশ বড় ধরণের পারফর্মেন্স বুস্ট থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। রাইজেনের স্টক স্পীড বনাম ওভারক্লকড স্পীডের গেমিং পারফর্মেন্স পার্থক্যের ভিডিওটি দেখে নিতে পারেন নীচের লিংক থেকে।

এছাড়া সিপিউর স্পীড যত বেশি হবে আপনার এডিটিং এর ল্যাগের পরিমাণ কমে আসবে এবং আপনার প্রজেক্ট স্টক স্পীডের থেকে অনেক তাড়াতাড়ি রেন্ডার হয়ে যাবে। যেমনঃ রাইজেন ২৭০০ এক্স সিপিউতে আপনার একটি ১৫ মিনিট দীর্ঘ 1080p ভিডিও রেন্ডার হতে স্টক স্পীডে ১২ মিনিট সময় নেয়। সিপিউকে ৪.০ গিগাহার্টজে ওভারক্লক করলে রেন্ডার টাইম ৭/৮ মিনিটে নেমে আসবে। এছাড়া, ওভারক্লক করলে আপনার প্রসেসরও জিপিউকে ফুল ইউটিলাইজ করতে পারবে।

২৪০০ মেগাহার্টজ বনাম ৩২০০ মেগাহার্টজ র‍্যাম

রাইজেন এখনো যে একটি দিক থেকে ইন্টেলের কোর সিপিউ থেকে পিছিয়ে আছে তা হচ্ছে কেইশ লেটেন্সি। মেমোরি ও কোর টাইমিং নিয়ে লেকচার দিয়ে আপনাদের বিরক্ত করব না। তা নিয়ে কোন একদিন আর্টিকেল দেয়া হবে। সংক্ষিপ্ত ভাষায়, র‍্যাম এবং কোর ল্যাটেন্সি ইন্টেল হতে রাইজেনের বেশি। যার কারণে একটি ২৪০০ মেগাহার্টজ স্পীডের র‍্যাম দিয়ে Core i5 8500 সিপিউতে যে পারফর্মেন্স পাওয়া যায়, তার থেকে কম পারফর্মেন্স পাওয়া যাবে রাইজেনের 2600/2600X প্রসেসরে স্টক স্পীড ব্যবহারে। সুতরাং, রাইজেনের সাথে হাই স্পীড মেমোরি কেনা একটি অত্যাবশ্যকীয় কাজ। কিন্তু র‍্যামের স্পীডের এই পারফর্মেন্স বুস্ট সম্পর্কে না জানার ফলে ক্রেতারা সামান্য কটি টাকা বাচানোর জন্য ৩০০০/৩২০০ মেগাহার্টজ স্পীডের র‍্যাম না নিয়ে ২৪০০ বাসের র‍্যাম কিনছেন। এর ফলে তারা প্রায় ৩০% থেকে ৩৫% এর মত বুস্টেড পারফর্মেন্স থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

র‍্যামের স্পীড এবং ডুয়াল চ্যানেল মেমোরি ইউটিলাইজেশন নিয়ে পিসি বিল্ডার বাংলাদেশ ইউটিউব চ্যানেলে এফাত আল মাউনের একটি ভিডিও আছে। এটি দেখলে র‍্যামের স্পীড নিয়ে আপনাদের কনফিউশন দূর হবে।

সিঙ্গেল বনাম ডুয়াল চ্যানেল র‍্যামের ভিডিও দেখে নিন এখানে ক্লিক করে

শুধুমাত্র প্রফেশনাল পারফর্মেন্স নয়, বরং গেমিং পারফর্মেন্সেও বেশ বড় ধরণের ভুমিকা রাখে র‍্যামের স্পীড। হাই স্পীড র‍্যাম ব্যবহার করার ফলে সাধারণ ২৪০০ বাসের র‍্যাম হতে ৮ থেকে ১৫/১৮ এফপিএস বুস্ট পাওয়া সম্ভব গেমিঙ্গে। তবে গেমের উপর ভিত্তি করে বুস্ট ৪/৫ এফপিএসেও নেমে আসতে পারে।

B450 vs X470 মাদারবোর্ড

যারা ওভারক্লক একদমই করতে চান না অর্থাৎ অফিস বা সাধারণ কাজের জন্য রাইজেনের এপিউ নিয়েছেন তাদের জন্য এই পার্ট নয়। আমরা উপরের দুটি অংশে কথা বলেছি সিপিউ এবং র‍্যাম ওভারক্লকিং নিয়ে। আপনারা জানেন, এ এম ডি রাইজেন প্রসেসরের জন্য প্রিমিয়াম X সিরিজের মেইন্সট্রিম চিপসেটের পাশাপাশি বাজেট B সিরিজের মাদারবোর্ডেও সিপিউ ওভারক্লকিঙ্গের সুবিধা দিয়েছে। এ কারণে বাজেট পিসি বিল্ডারদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে B350 এবং B450 চিপসেটের মাদারবোর্ড। কিন্তু দেখা যাচ্ছে রাইজেনের ৬ কোরের এক্স প্রসেসর বা ৮ কোরের প্রসেসরের জন্য অনেকেই B সিরিজের মাদারবোর্ড নিচ্ছেন যা একদমই কাম্য নয়। ‘একটা নিলেই হয়‘ এমন মনোভাব নিয়ে মাদারবোর্ড ক্রয়ের ফলে পুরো সিস্টেমকে ক্রেতা একটি বড় ধরনের রিস্কের সম্মুখীন করছেন যা তিনি নিজেও জানেন না।

B450 মাদারবোর্ডে চিপসেটে বেশ কিছু লিমিটিং ফ্যাক্টর রয়েছে যা X470 মাদারবোর্ডে নেই। যেমন, এই মাদারবোর্ডে আপনি শুধুমাত্র এ এম ডির ক্রসফায়ার করতে পারবেন, তাও X8/X4 মোডে। অর্থাৎ, ক্রসফায়ার করলে আপনি আপনার জিপিউ সম্পূর্ণ ইউটিলাইজ করতে পারবেন না। এনভিডিয়ার ক্ষেত্রে এস এল আই বা এনভিলিংক কোনটিই আপনি করতে পারবেন না। এছাড়া, পিসিআই এক্সপ্রেসের সংখ্যা X470 চিপসেট থেকে B450 তে অনেকাংশেই কম। যার কারণে, NVMe SSD লাগানর ক্ষেত্রে বেশ কিছু লিমিটিং ফ্যাক্টর কাজ করবে।

এছাড়া, আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে মাদারবোর্ডের VRM সিস্টেম। অর্থাৎ, যা আপনার সিপিউকে পাওয়ার দেবে সেটার সংখ্যা। B সিরিজ মূলত বাজেট সিরিজের মাদারবোর্ড হওয়ায় এর মধ্যে কম সংখ্যক VRM দেয়া হয়। X370/X470 মাদারবোর্ডে সাধারণত 4+4, 6+2 বা 6+4 ফেইজের পাওয়ার ডেলিভারি সিস্টেম থাকলেও একদম প্রিমিয়াম মাদারবোর্ডেও 4+2 এর থেকে বেশি ফেইজের পাওয়ার ডেলিভারি সিস্টেম নেই। বাজেট সিরিজে অবশ্য 4 ফেইজ পাওয়ার ডিজাইনই বেশি থাকে। এর ফলে B450 মাদারবোর্ডে ওভারক্লক করা গেলেও, তেমন বেশি কিছু করা যায় না। কারণ, পাওয়ারের লিমিট একটা ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং B সিরিজের মাদারবোর্ড দিয়ে আপনি রাইজেন এপিউ বা 2600 পর্যন্ত নিশ্চিন্তে ৩.৮/৩.৯ গিগাহার্টজ স্পীডে ওভারক্লক করতে পারলেও, রাইজেন 2600x/2700/2700x এর জন্য একটি ভালো মানের X470 মাদারবোর্ড আবশ্যিক। কারণ, X সিরিজের সিপিউকে ওভারক্লক এবং হ্যান্ডেল করার মত ক্যাপাবিলিটি B450 মাদারবোর্ডের নেই।

Conclusion

আজ আমরা রাইজেন সিপিউ নিয়ে ভুল ধারণার বেশি গভীরে যাই নি। বরং, বাংলাদেশের মানুষের বেসিক কিছু ভুল ধারণা নিয়েই কথা বলেছি। অবশ্য কমেন্ট সেকশনের অনুরোধের ভিত্তিতে এটি নিয়ে ২য় পর্ব করা হতে পারে। আর্টিকেলের মধ্যে বেশ কিছু ভুল ত্রুটি থাকতে পারে। যেখানে ভুল আছে ধরিয়ে দিলে কৃতজ্ঞ থাকব এবং ভবিষ্যতে এমন কি ধরণের লেখা চান ফেইসবুক পেইজের কমেন্ট সেকশনে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না।

পিসি বিল্ডার বাংলাদেশ ফেইসবুক পেইজ