আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলবো। বাংলাদেশ ইন্টারনেট সেবা মূলত দুই ভাবে পাওয়া যায়। একটি হচ্ছে মোবাইল অপারেটরদের মাধ্যমে, আরেকটি হচ্ছে ব্রডব্যান্ড সংযোগের মাধ্যমে। মোবাইল অপারেটর এবং ব্রডব্যান্ড সংযোগ এই দুটির মধ্যে বেশ পার্থক্য রয়েছে, আর আমি জানি যে আপনারা পার্থক্যগুলো জানেন।
এখন কথা হচ্ছে যে যারা ব্রডব্যান্ড সংযোগ ব্যবহার করেন তারা ইদানিং বা হঠাৎ করে শুনে থাকবেন যে আপনার ISP আপনার ব্রাউজারিং বা Internet Usage কে মনিটর করতে পারে! তখন আপনার মনে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগবে, আসলেই কি???

এর সহজ উত্তর হচ্ছে “হ্যাঁ” !!! আপনার ISP আপনার ইন্টারনেট কানেক্টশনকে নিয়ন্ত্রণ করে, আর স্বাভাবিক ভাবেই তাদের জন্য আপনার ডাটাকে মনিটর করা সহজ হয়। মানে আপনার ISP এর লোক তাদের অফিসে বসে আপনি কোন কোন সাইটে ব্রাউজ করছেন সেটা দেখতে পারবে আর একই সাথে এই তথ্যগুলোকে অন্যদের সাথেও শেয়ার করতে পারবে!

উপরের চিত্রটি দেখলেই সব পরিস্কার হয়ে যাবে। চিত্রটি খুলনার একটি স্থানীয় ISP এর ফেসবুক পোষ্ট থেকে নেওয়া। এখানে বলা হচ্ছে যে যাকে তাকে আপনার WiFi পাসওর্য়াড দেওয়া থেকে বিরত থাকতে। কারণ তাদের কাছে ২৪/৭ ইউজার লগ “সংরক্ষণ” করা হয়ে থাকে। আর এই সংরক্ষিত লগটি BTRC চাওয়া মাত্রই তাদেরকে দিয়ে দেওয়া হয়।

আর এই “সংরক্ষণ” এর জন্যেও আলাদা নীতিমালা এবং রুলস রয়েছে। তবে কেউ যে এই নীতিমালা ভঙ্গ করে আপনার ব্যক্তিগত তথ্যে হানা দিবে না এমন কি কোনো গ্যারান্টি রয়েছে? চলুন প্রথম থেকেই আলোচনা শুরু করা যাক।

আপনার ISP ??

আপনার যদি ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ থাকে তাহলে সেটা একটি ISP এর মাধ্যমে দিয়ে দেওয়া হয়ে থাকে। ISP মানে Internet Service Provider । সহজ ভাষায় বলতে গেলে আপনার ক্যাবল কোম্পানিকেই ISP বলা হয়। আরো সহজ ভাষায় বললে, আপনার ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগটি তো কেউ না কেউ ক্যাবল দিয়ে আপনার পিসির সাথে লাগিয়ে দিয়ে গিয়েছে; এই “কেউ না কেউ” ই হচ্ছে ISP কোম্পানির লোক।
আর আপনার ইন্টারনেট সংযোগটি পুরোপুরি এই ISP নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

আপনার ISP আপনার সম্পর্কে এমনিতেই অনেক কিছু জেনে থাকে। বিশেষ করে তারা আপনার বাসায় / অফিসে নিজেরদের লোকদের দিয়েই কিন্তু ব্রডব্যান্ড ক্যাবল সংযোগ সেট করে যায়। মানে আপনার বাসার ফিজিক্যাল ঠিকানা তাদের কাছে থাকে (অবশ্যই এটার প্রয়োজন তা নাহলে নেট বিল কিভাবে সংগ্রহ করবে তারা!!)।
আর আপনার IP এড্রেস থেকে যদি কোনো বেআইনী কার্যক্রম করা হয় বা আপনাকে যদি IP এড্রেস দিয়ে গ্রেফতার পরোয়ানা জারি করা হয় তাহলে আইন সংস্থার লোক এই IP এড্রেস ধরেই আপনাকে পাকড়াও করবে । কিন্তু কিভাবে? এই আপনার IP এড্রেসটি নিয়ে তারা আপনার ISP কোম্পানির কাছে যাবে। আর সেখানের লোক তো আপনার বাসা পর্যন্ত চিনে, তাই সেখান থেকেই আইনী সংস্থা আপনার ফিজিক্যাল লোকেশন সম্পর্কে জানতে পারে।

এখন কথা হচ্ছে আপনার IP এড্রেস দিয়ে কিভাবে আপনার ISP কোম্পানির সম্পর্কে জানা যায়? এ জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন।

এখানে দেখুন, আমার আইপি এড্রেস শুধুমাত্র আমার লোকেশনই নয়, বরং আমার ISP কোম্পানির নাম, আমি কোন অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করছি এমনকি এখন বর্তমানে আমি কোন ব্রাউজারটি ব্যবহার করছি এটাও বলে দিচ্ছে। তবে মনে রাখবেন, এটা পাবলিক সাইট মাত্র; আইনী সংস্থা চাইলেই আপনার IP এড্রেস দিয়ে আপনার পিনপয়েন্ট লোকেশন বের করার ক্ষমতা রেখে থাকে।

বি:দ্র: তবে মনে রাখবেন যে, যদি কেউ আপনার IP এড্রেস ব্যবহার করে আপনার বর্তমান লোকেশন জানার জন্য চেষ্টা করে তাহলে সাধারণত তাদেরকে আইনী সংস্থা এবং কোর্ট অর্ডারের প্রয়োজন পড়ে। কারণ আইপি এড্রেস দিয়ে লোকেশন বের করাটা আপনার নিজের ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে লঙ্ঘন করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, কেউ যদি আইনী সংস্থা ছাড়া বা কোর্ট অর্ডার ছাড়া আপনার IP এড্রেস দিয়ে আপনার ফিজিক্যাল লোকেশন বের করে তাহলে সেটাও একধরণের বেআইনী কাজ হবে।

আপনার সংযোগ নিয়ন্ত্রণ

আপনার ISP একই সাথে আপনার ব্রডব্যান্ড সংযোগকে সম্পূর্ণ ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। আপনি আপনার ISP এর সাথে কানেক্ট থাকেন; আপনার পিসি থেকে ডাটা রিকোয়েস্ট প্রথমে ISP এর কাছে যায়; তারপর ISP থেকে ডাটাটি ইন্টারনেটে যেখানে যাবার দরকার সেখানে চলে যায়। এটা তাদের বিশেষ একটি হার্ডওয়্যারের মাধ্যমে হয়ে থাকে, একে সার্ভার বলা হয়। আর তারা চাইলেই এই সার্ভারের ভেতরে “sneak a peek” করতে পারে! হাহাহাহা (!)

আপনার কানেক্টশন নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমেই আপনার কাঙ্খিত নেট স্পিড তারা আপনাকে দিতে পারে। আর তা না হলে কোম্পানির সবাই হাই স্পিড ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারতো।

এখন কথা হচ্ছে তারা কেনই বা আপনার ডাটা, আপনার ইমেইল বা আপনার ইন্টারনেট ব্যাংকিং এর উপর সরাসরি নজর রাখবে? এর উত্তর হচ্ছে, তারা “সরাসরি” নজর রাখে না। তাদের “সরাসরি” নজর রাখার জন্য আইনী সংস্থা থেকে নির্দেশ না দিলে তারা এই কাজ করবে না।
আর আমার আপনার মতো সাধরণ জনগনের টেরাবাইটের উপর টেরবাইট ডেটা এমনি এমনি রাত জেগে ঘাঁটার ISP ওয়ালাদের অত সময়ও নেই!

মূল কথা হচ্ছে, “আপনি সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী হয়ে থাকলে আপনার ISP থেকে কোনো কিছু লুকানোর প্রয়োজন হবে না, কিন্তু আপনি যদি ইন্টারনেটে বেআইনী কাজ করেন, কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী কাজে লিপ্ত থাকেন তাহলে আপনার জন্য অন্য কথা ”

কি ধরণের লগ “সংরক্ষিত” থাকে?

[2019/03/09 18:34:44] facebook.com
[2019/03/09 18:35:23] plannedparenthood.org
[2019/03/09 18:42:29] dcabortionfund.org
[2019/03/09 19:02:12] maps.google.com

সাধারণত আপনার ব্রাউজিং হিস্টোরিগুলো এই জাতীয় লগ আকারে ISP এর কাছে সংষ্কক্ষিত থাকে। প্রতিদিনের লগ ফাইল একটি টেক্স ফাইলে ফোল্ডার হিসেবে ISP এর আলাদা সার্ভারে সেভ করা হয়ে থাকে। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ সরকারের আইন অনুযায়ী এই কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে। এই লগ সংরক্ষণ না করলে উল্টে আপনার ISP এর লাইসেন্স বাতিল হবার চান্স থাকে। চিন্তা করে দেখুন, আপনি প্রতিদিন কত শত সাইটে ব্রাউজ করছেন। আপনার মতো হাজারো ইউজার একটি ISP এর নেট থেকে ব্রাউজ করছে। প্রতিদিন হাজার হাজার লগ ফাইল ISP দের কে লগ ফাইল আকারে সংরক্ষণ করতে হয়। এই নিয়ম না থাকলে উল্টো ISP দেরই বেশি সুবিধা, কারণ তাদেরকে টাকা খরচ করে লগ ফাইল সংরক্ষণের জন্য আলাদা সার্ভার বানাতে হতো না।

আপনি কোনো কিছু ডাউনলোড করলে ওই ডাউনলোড লিংক (direct link) টাও কিন্তু লগে সেভ হয়ে থাকে।  যেমন ফিউশন বিডি থেকে BhootFM ডাউনলোড করছেন এই লিংক থেকে। এখন http://radiospecials.fusionbd.com/download.php?file=All_Files/Bhoot_FM/HD-64kbps/November_2019/Bhoot_FM-15-11-2019-HD_FusionBD.Com.mp3

এই লিংকটি টেক্স আকারেই লগে সেভ হয়ে যাবে।

তাই বলা যায় যে, আপনার ISP আপনার IP এড্রেস এর ভিক্তিতেই যাবতীয় লগ সংরক্ষণ করে থাকে। মানে হলো:

  • অনলাইনে আপনার যাবতীয় URL ভিজিট লিংক (HTTPS ছাড়া)
  • আপনি কোন কোন সাইট বেশি ভিজিট করেন
  • আপনি কখন অনলাইনে / অফলাইনে থাকেন
  • কোন ওয়েবসাইটে কতটুকু সময় ব্যয় করেন

এই বিষয়গুলো আপনার আইপি এড্রেস দিয়ে ISP রা করতে পারবে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শুধুমাত্র সরকারি আদেশের কারণেই খালি লগ ফাইলটাই IP হিসেবে সেভ করা হয়ে থাকে; অন্যদিকে বিদেশে অনলাইনে লেনদেন ব্যাংকিং সহ সবকিছুই অনলাইনে হয় তাই বিদেশের ISP রা তাদের ইউজারদের এই লগ ফাইলকে বিভিন্ন বড় বড় কোম্পানিদের কাছে বিক্রি করে থাকে।

VPN দিয়ে কানেক্ট থাকলে সেটা ISP বুঝতে পারবে কি?

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বললে এক কথা আর বিদেশের প্রেক্ষাপটে বললে আরেক কথা। বাংলাদেশে কথা বললে, আপনি VPN কানেক্ট করলে আপনার IP চেঞ্জ হয়ে যাবে, আর যেহেতু সরকার আর আইনি সংস্থা ছাড়া আপনার লগ ISP আর অন্য কাউকে দেবে না তাই আপনি VPN দিয়ে কানেক্ট করলে ISP সহ কেউই বুঝতে পারবে না। কারণ আপনার আইপি হচ্ছে সুইজারল্যান্ডের! আপনার আইপি এড্রেস ক্যাচ করে পুলিশ যখন আপনার ISP এর কাছে যাবে তখন ISP চেক করে দেখবে যে আপনি অন্য দেশে বসবাস করেন(!)

তবে বিদেশে এডভান্স প্রযুক্তির ফলে বিদেশি ISP গুলো এটা বুঝতে পারবে যে আপনার পিসির ডাটা ট্রাফিকগুলো VPN Server এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আর বাংলাদেশে যেহেতু VPN ব্যবহার করা অবৈধ্য না, তাই বাংলাদেশের ISP দের এই দামি প্রযুক্তি ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়ে না।

তবে মনে রাখবেন, VPN (বিশেষ করে ফ্রি) গুলো নিজেরাও কিন্তু আলাদা করে লগ রেখে থাকে। একটি VPN সাধারণ দুই ধরণের লগ ফাইল সেভ রাখে; একটি হচ্ছে traffic logs আর আরেকটি হচ্ছে Connection Logs । ট্রাফিক লগে আপনি কোন কোন সাইট ভিজিট করছেন আর কি কি ডাউনলোড করছেন সেগুলো সেভ থাকে আর কানেক্টশন লগে ভিপিএন কানেক্ট নিয়ে যাবতীয় তথ্য মজুদ থাকে। তাহলে যেই লাউ সেই কদু। এজন্য যে ভিপিএন কোনো প্রকার লগ সেভ রাখে সেগুলো ব্যবহার করুন।

ISP ট্রাকিং থেকে বেঁচে থাকবেন কিভাবে?

উপরের তথ্যগুলো পড়ার পর জানতে পারলেন যে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আপনার ISP “বাধ্য” হয়েই আপনার ব্রাউজিং হিস্টোরিগুলো লগ রেখে থাকে । আর তাহলে আমাকে প্রশ্ন করতে পারেন যে এই ISP ট্রাকিং থেকে বেঁচে থাকার উপায় কি?

এর উত্তর হচ্ছে, ISP ট্রাকিং থেকে ১০০ ভাগ বেঁচে থাকার কোনো উপায় নেই। আর এই ট্রাকিং সিস্টেমটি সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী মানে বৈধভাবেই পরিচালনা করা হয়ে থাকে, তাই আপনার এই ট্রাকিং নিয়ে মাথাব্যাথা হওয়ার কোনো কারণ নেই, অন্তত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তো নয়ই!

তবে বৈধ হবার পরেও যারা ISP লোকদেরকে ভরসা করতে পারেন না তাদের জন্য নিচের কিছু পদ্ধতি আমি তুলে ধরছি, এগুলো অনুসরণ করলে অনেকটাই ISP ট্রাকিং কমিয়ে আনা সম্ভব:

১) HTTPS সাইট ব্যবহার করুন। কারণ HTTPS সাইটগুলো নিজেদের থেকেই এনক্রিপ্ট হয়ে থাকে। বিশেষ করে ডাটা টান্সফারের সময় এনক্রিপ্ট হয়ে থাকলে বেসিক হ্যাকিং এট্যাক থেকেও বেঁচে থাকতে পারবেন। গুগল ক্রোম, মজিলাতে আপনি HTTPS Everywhere এক্সটেনশনটি ব্যবহার করতে পারেন।

২) Tor ব্যবহার করতে পারেন। যারা VPN ব্যবহার করতে চান না তারা স্পেশাল TorBrowser কে ব্যবহার করতে পারেন। টরের নিজস্ব আলাদা অনেকগুলো ভার্চুয়াল টানেল রয়েছে যেখানে আপনাকে আলাদা প্রটেক্টেড আইপি দেওয়া হয়ে থাকে যেটা আপনার নিজের আইপি থেকে আলাদা।

৩) Off-Shore ভিপিএন ব্যবহার করুন। Off-Shore মানে যে ভিপিএনগুলো কোনো প্রকার লগ ফাইল ব্যবহার করে না সেগুলো। এদের মধ্যে NordVPN এবং BolehVPN সেরা।

পরিশিষ্ট

তাহলে পোষ্ট পড়ে জানতে পারলে যে, হ্যাঁ আপনার ISP আপনার ইন্টারনেটের গতিবিধি চাইলেই দেখতে পারে। কিন্তু তারা এটা দেখে না কারণ তাদের দেখার সময়ও নেই। তবে সরকারি আদেশ অনুযায়ী আপনার IP এড্রেস এর কার্যবিধি তারা সংরক্ষণ করে রাখে, যাতে পরবর্তীতে সরকারি সংস্থার কেউ চাইলে তাদের কে এটা দিতে পারে। আর সাধারণত আপনাকে এটা নিয়ে মাথাব্যাথা করতে হবে না। তবে যারা প্রাইভেসি নিয়ে বেশি সচেতন তারা ভিপিএন সার্ভিস ব্যবহার করতে পারেন। তবে ফ্রি ভিপিএন ব্যবহার করা আর না করা একই কথা।

Avatar
Fahad is a freelance writer and editor with nearly 10 years' experience in Bangla Technology Blogging who, while not spending every waking minute selling himself to websites around the world, spends his free time writing. Most of it makes no sense, but when it does, he treats each article as if it were his Magnum Opus - with varying results.