আমরা কম বেশি সবাই কেউ না কেউ কম্পিউটার ব্যাবহারকারী। সামান্য ১০/১৫ হাজার টাকার কম্পিউটার থেকে শুরু করে লাখ লাখ টাকার কম্পিউটারও অনেকে ব্যাবহার করছেন। আর কম্পিউটার বলুন বা মোবাইল বলুন, যে কোন স্মার্ট ডিভাইস বা সিস্টেমের কোর সফটওয়্যার হচ্ছে এর অপারেটিং সিস্টেম বা ওএস। সেই ১৯৮৫ সালে উইন্ডোজ ১.০১ রিলিজ হওয়া থেকে শুরু করে বর্তমান ২০১৮ সাল চলাকালীন পর্যন্ত রিলিজ হয়েছে উইন্ডোজ ১০ সহ মোটামুটি প্রায় ২৬ ধরণের উইন্ডোজ এবং তাদের অগণিত ভার্শন আর আপডেট। কিন্তু যা বললাম, এখন চলছে ২০১৮ সাল। মোটামুটি আমরা সবাই বাজেট লেভেলের হলেও ল্যাটেস্ট বা তার তিন/চার জেনারেশন আগের পর্যন্ত হার্ডওয়্যার ব্যাবহার করছি। তাই বিভিন্ন ফিচার এবং সুবিধার কথা চিন্তা করে কেন আপনাকে উইন্ডোজ ১০ ব্যাবহার করতে হবে তা নিয়েই আমাদের আজকের এই আর্টিকেল।

বি:দ্র: এখানে কেবল Windows 7 vs Windows 10 নিয়েই কথা হবে। Windows 8/8.1 এর পারফর্মেন্স Windows 7 এর মতই কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে এটির পারফর্মেন্স 7 এর থেকেও অনেকাংশে কমে যাওয়ার চিত্র দেখা গিয়েছে। তাই Windows 8/8.1 এর কথা এখানে আনা হবে না।

Better Gaming Experience

উইন্ডোজ ১০ আপনাকে নিশ্চিত করবে বেটার গেমিং এক্সপেরিয়েন্স আগের জেনারেশনের উইন্ডোজের থেকে। কিন্তু কিভাবে তা অফার করবে আর কি কারণেই বা আপনি গেমিঙের জন্য উইন্ডোজ ১০ কে বেছে নেবেন তা নিয়েই আলোচনা করা হল নীচে।

Direct X 12

উইন্ডোজ ১০ রিলিজের সময় গেমিঙের জন্য যে ফিচার হলাও করে প্রচার করা হয়েছিল তা হল ডিরেক্ট এক্স ১২ বা DX12। আর এই DX12 এপিআই কেবল উইন্ডোজ ১০ অপারেটিং সিস্টেমের জন্য এক্সক্লুসিভ। ডিরেক্ট এক্স কি সেটা নিয়ে এখন বেশি কিছু বলতে পারব না কিন্তু এটি সম্পর্কে যদি জানতে চান তাহলে পরামর্শ দেব উইকিপিডিয়া পেইজ থেকে ঘুরে আসার।

বেসিক্যালি DX12 আপনাকে অফার করছে পরবর্তী জেনারেশনের হার্ডওয়্যারের জন্য বেটার গ্রাফিক্স কম্প্যাটিবিলিটি এবং ইন গেইম বেটার ফ্রেমস পার সেকেন্ড। এছাড়াও, DX12 এপিআইয়ে তৈরি গেমগুলোও হয় অনেক কালার রিচ অর্থাৎ সেগুলো দেখতে অনেকটাই সুন্দর লাগে। এছাড়া DX12 এ রয়েছে HDR কম্প্যাটিবিলিটি যদিও বর্তমানের পিসি গেমগুলো এখনো এই ফিচারের সুবিধা নিতে পারছে না হার্ডওয়্যার ও ড্রাইভার লিমিটেশনের কারণে।

যদিও এখন প্রায় সব গেম DX11 এপিআই ব্যাবহার করছে কিন্তু গত ৩ বছরে বেশি কিছু গেমের মধ্যে আমরা DX12 এর প্রয়োগ দেখতে পাচ্ছি। EA, Ubisoft, Square Enix সহ নামকরা গেম পাবলিশার তাদের প্রায় সকল গেমেই DX11 এর পাশাপাশি DX12 এর সিস্টেম ইন্টিগ্রেড করে রাখছে। আশা করা যাচ্ছে আগামি ৩ থেকে ৪ বছরের মধ্যেই DX12 গেম ডেভেলপমেন্টে মেইনস্ট্রিম হয়ে উঠবে। তাই DX12 এর গেমগুলোকে আপনি যদি ফুল ইউটিলাইজ করতে চান বা DX12 এ তৈরি এক্সক্লুসিভ গেমগুলো খেলতে চান আপনাকে অবশ্যই উইন্ডোজ ১০ ব্যাবহার করতে হবে।

Better Framerate

এই জায়গাটায় অনেকের মনে কনফিউশন থাকে। উইন্ডোজ ১০ সেটাপ দিলে কি আমি সত্যিই আগের জেনারেশনের উইন্ডোজ থেকে ভাল এফপিএস আর ইনপুট টাইম পাবো? উত্তর হচ্ছে অনেকটা মিশ্র। আসলে আপনি কেমন ইন গেইম পারফর্মেন্স পাবেন তার ৩০ শতাংশ নির্ভর করে আপনার জিপিউর জন্য ইন্সটল করা ড্রাইভারের উপর। অনেক সময় দেখা যায় লেস ডিমান্ডিং গেম যেমন ডোটা ২, ফোরট নাইট, লীগ অফ লেজেন্ডস সহ অনেক গেমেই উইন্ডোজ ৭ এ ভাল ফ্রেম রেট পাওয়া যাচ্ছে। সেই দিক থেকে হয়ত আপনি বলতে পারেন তাহলে আর আপগ্রেড করা কি দরকার। কিন্তু মেজর ট্রিপল এ বড় সাইজের যে সকল গেম আছে সেগুলোর পারফর্মেন্স উইন্ডোজ ১০ এ তুলনামূলকভাবে ভাল হয়। এই জিনিসটা ভাল হবে আপনারা ইউটিউবে ভিডিও দেখলেই বুঝতে পারবেন।

২০১৮ সালে রিলিজ হওয়া গেমের টেস্ট

২০১৮ সালের আগে রিলিজ হওয়া গেমের টেস্ট

Windows 10 Exclusive Games

এই অংশটা যদি উপরেই বলে দিতাম তাহলে বাকি অংশটুকু পড়ার আগ্রহ অনেকেই হারিয়ে ফেলতেন। কিন্তু গেমিং এর দিক থেকে উইন্ডোজ ১০ এ সবচেয়ে বেশি যে সুবিধাটি পাবেন তা হল এই অপারেটিং সিস্টেমের জন্য থাকা এক্সক্লুসিভ গেমস। Crackdown 3, Forza Motosport, Forza Horizon, Gears 5, Halo সহ অনেক গেম আছে যেগুলো কেবল এভেল্যাবল থাকবে শুধু মাত্র এক্সবক্স ওয়ান আর উইন্ডোজ ১০ অপারেটিং সিস্টেমের জন্য।

অর্থাৎ এই গেমগুলো স্টীমে এভেল্যাবল থাকবে না। আর যেহেতু স্টীমে এভেলেবিলিটি থাকবে না তাই অন্যান্য অপারেটনিং সিস্টেমে চলার কোন সম্ভাবনাই নেই এই গেমগুলোর। সুতরাং আপনি যদি মাইক্রোসফটের বড় গেমগুলো খেলতে চান তাহলে আপনাকে অবশ্যই উইন্ডোজ ১০ কম্পিউটারে ইন্সটল করে রাখতে হবে।

মাইক্রোসফটের E3 2018 এর প্রেজেন্টেশন এখানে দেখুন

Software Compatibility

এবার আসা যাক সফটওয়্যারের দিকে। দিন যত এগিয়ে যাচ্ছে পুরোন ওএসের জন্য সফটওয়্যার সাপোর্ট এবং কম্প্যাটিবিলিটি ততই কমে যাচ্ছে। উইন্ডোজ ১০ এর জন্য তৈরি করা সফটওয়্যারগুলোতে বিভিন্ন ধরণের নতুন নতুন ফিচার প্রতিনিয়ত এড করা হচ্ছে যা উইন্ডোজ ৭, ৮ বা ৮.১ এর মধ্যে থাকা সফটওয়্যারগুলোতে খুজে পাওয়া যাবে না।

Hardware Compatibility

এবার আসা যাক হার্ডওয়্যার কম্প্যাটিবিলিটির দিকে। ইন্টেল এবং এ এম ডি দুই মেজর কোম্পানিই ঘোষণা দিয়ে ফেলেছে গত বছর থেকেই তাদের সকল প্রেজেন্ট এবং আপকামিং হার্ডওয়্যার যেমন প্রসেসর, মাদারবোর্ড, জিপিউ সব কিছু হবে কেবল উইন্ডোজ ১০ কম্প্যাটিবল। সুতরাং আপনি যদি ল্যাটেস্ট জেনারেশনের হার্ডওয়্যার দিয়ে কম্পিউটার বিল্ড করতে চান বা এদের ল্যাপটপ কিনেন আপনাকে আবশ্যিকভাবেই উইন্ডোজ ১০ ব্যাবহার করতে হবে।

Future Proof OS

যে কোন অপারেটিং সিস্টেমের জন্য সবচেয়ে ইম্পরট্যান্ট যে বিষয়টি হচ্ছে এর ফিউচার প্রুফিং। অর্থাৎ আর কত বছর এই অপারেটিং সিস্টেম অফিসিয়ালি টিকে থাকবে। এই পর্যন্ত সবচেয়ে ফেমাস অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে এখনো মানুষের মনে জায়গা করে আছে উইন্ডোজ এক্সপি। ২০০১ সালে রিলিজ হবার পরে এর ইজি টু ইউজ এবং সফটওয়্যার ও গেম কম্প্যাটিবিলিটির কারণে অনেক জনপ্রিয়তা লাভ করে। কিন্তু অফিসিয়ালি এটির লাইফটাইম শেষ হয়ে যায় ২০১৪ সালে। অর্থাৎ প্রায় ১৩ বছর ধরে এক্সপি অফিসিয়ালি চলেছে। এখন এই অপারেটিং সিস্টেমের জন্য কোন ধরণের আপডেটেড ড্রাইভার, সফটওয়্যার এবং গেম পাওয়া যায় না। ২০০৯ সালে রিলিজ হয় উইন্ডোজ ৭। অলরেডি ৯ বছর অতিক্রম করে ফেলেছে এই অপারেটিং সিস্টেম। আর বেশি করে হলেও ২০২২ সাল পর্যন্ত এর লাইফটাইম দেখা যাচ্ছে। এরপরে আপনাকে ল্যাটেস্ট সব ফিচারের জন্য উইন্ডোজ দশের দিকে আসতে হবেই। আর মাইক্রোসফটের মতে তারা আপাতত পরবর্তী জেনারেশনের কোন অপারেটিং সিস্টেম নিয়ে আপাতত কোন প্রকারের কাজ করছে না। তাই উইন্ডোজ ১০ কে মিনিমাম আগামি ৮/৯ বছরের জন্য ফিউচার প্রুফ অপারেটিং সিস্টেম বলা যায়।

কাদের উইন্ডোজ ১০ ব্যাবহার করা উচিত নয়?

বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে অনেকেই আছেন যারা একদম ব্র্যান্ড নিউ কম্পিউটার ব্যাবহার করেন না। যারা রাস্তার দোকানে গান লোড করেন বা দোকানের হিসাব নিকাশ করেন তাদের জন্য নিম্ন মানের কম্পিউটার আনায়াসেই চলে যায়। এছাড়াও কেবল মুভি দেখা বা সামান্য ওয়েব ব্রাউজিং এর উদ্দেশ্য নিয়ে যারা কম্পিউটার কিনেন তাদের সিস্টেমের হার্ডওয়্যারও অনেক নীচের লেভেলের হয়ে থাকে। সুতরাং এক অর্থে উইন্ডোজ ১০ তাদের জন্য নয় যারা গেমিং বা হেভি প্রফেশনাল কাজের জন্য কম্পিউটার নিচ্ছেন না বরং সাধারণ ব্যাবহারই হচ্ছে মূল উদ্দেশ্য। নীচের লেভেলের হার্ডওয়্যার দিয়ে এই অপারেটিং সিস্টেম চালানো সম্ভব নয়। আমার রেকমেন্ডেশন হচ্ছে ২৫ হাজার টাকা বা তার নীচের বাজেটে যারা ব্র্যান্ড নিউ বা সেকেন্ড হ্যান্ড ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ যে সিস্টেমই নিচ্ছেন না কেন তার জন্য উইন্ডোজ ৭ ব্যাবহার করা। আর হার্ডওয়্যার যদি বেশি পুরোন হয়ে থাকে তাহলে আপনাকে না চাইলেও এক্সপি ব্যাবহার করতে হবে।

কারা উইন্ডোজ ১০ ব্যাবহার করবেন?

তাহলে এখন প্রশ্ন আসে যে কারা উইন্ডোজ ১০ ব্যাবহার করবেন। উত্তর হচ্ছে উপরে উল্লেখিত সিস্টেমের মালিক ছাড়া বাকি সবাই। যারা নতুন কম্পিউটার কিনতে যাচ্ছেন বা কিনে ফেলেছেন তারা তো অবশ্যই এই অপারেটিং সিস্টেম ব্যাবহার করবেন। আর যারা এখনো ২০১১ বা তার পরবর্তী সময়ের মোটামুটি ভাল ধরণের হার্ডওয়্যার যুক্ত সিস্টেম ব্যাবহার করছেন হোক সেটা প্রফেশনাল বা গেমিং এর উদ্দেশ্যে, তাদের জন্যও এই অপারেটিং সিস্টেম রেকমেন্ডেড। উইন্ডোজ ৭ ব্যাবহার করে যদি আপনি একেবারেই অভ্যস্ত হয়ে যান তাতেও উইন্ডোজ ১০ এ ট্রাঞ্জিশন করতে আপনার কোন অসুবিধা হবে না যেহেতু উইন্ডোজ ৭ এর সকল ফিচার + আরো অনেক কিছুই আপনি এই অপারেটিং সিস্টেমে পাচ্ছেন।

Conclusion

তো আপনারা জেনে নিলেন কেন এই ২০১৮ সালে এসে আপনাকে মাস্ট উইন্ডোজ ১০ ব্যাবহার করা দরকার। উপরে অবশ্য উল্লেখ করে দেয়া হয়েছে কি কি পরিপ্রেক্ষিতে এটি আপনার জন্য আবশ্যকীয় নয়। কিন্তু আপনি যদি বেটার গেমিং এক্সপেরিয়েন্স, স্মুথ ব্রাউজিং, সফটওয়্যার কম্প্যাটিবিলিটি এবং আরো অনেক সুযোগ সুবিধা পেতে চান তাহলে আপনাকে অবশ্যই উইন্ডোজ ১০ ব্যাবহার করতে হবে। এই সময়ে এসে এটি যে সকল ফিচার আপনাকে অফার করছে এটির নীচের ভার্শনের কোন উইন্ডোজই আপনাকে অফার করতে পারবে না।

আপনারা সবাই ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন আর সঙ্গে থাকুন পিসিবি বিডির সাথেই।

আর সময় পেলে পরে আসতে পারেন আমাদের ইয়াং রাইটার কাওছার চৌধুরীর কিভাবে ব্র্যান্ডের আসল পাওয়ার ব্যাঙ্ক চিনবেন সেই সম্পর্কিত আর্টিকেলটি। সেটি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন